ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ময়মনসিংহে ১ কোটি ২০ লাখ টাকার নকল সিগারেট ও মাদক তৈরির সরঞ্জাম জব্দ, তথ্য গোপনের অভিযোগ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 13, 2026 ইং
ময়মনসিংহের সুহিলায় যৌথ অভিযানে নকল সিগারেট ও মাদক তৈরির সরঞ্জাম জব্দের দাবি; ঘটনাটি ঘিরে উঠেছে নানা অভিযোগ। ছবির ক্যাপশন: ময়মনসিংহের সুহিলায় যৌথ অভিযানে নকল সিগারেট ও মাদক তৈরির সরঞ্জাম জব্দের দাবি; ঘটনাটি ঘিরে উঠেছে নানা অভিযোগ।

সহকারী কমিশনারের বিরুদ্ধে মালিককে পালাতে সহায়তা ও অসংগতিপূর্ণ বক্তব্যের অভিযোগ, তথ্য চাইতে গিয়ে সাংবাদিকদের দুর্ব্যবহারের শিকার হওয়ার দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ | খবর সারাক্ষণ

ময়মনসিংহের গাগড়া ইউনিয়নের সুহিলা এলাকায় একটি অবৈধ কারখানায় যৌথ অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নকল সিগারেট ও মাদক তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। উদ্ধার করা মালামালের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে এত বড় অভিযানের তথ্য প্রকাশ না করা, জব্দ করা মালামালের মূল্য নিয়ে অসংগতিপূর্ণ বক্তব্য এবং কারখানার মালিককে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ময়মনসিংহের সহকারী কমিশনার মো. ফিরোজ হোসেন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে।

এদিকে অভিযানের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দুর্ব্যবহার ও হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেও কমিশনারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন প্রতিবেদক।

যৌথ অভিযানে জব্দ বিপুল পরিমাণ নকল সিগারেট

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ অক্টোবর ময়মনসিংহের গাগড়া ইউনিয়নের সুহিলা এলাকার একটি কারখানায় অভিযান চালানো হয়। কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ময়মনসিংহের সহকারী কমিশনার মো. ফিরোজ হোসেন বিশ্বাসের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) এবং কোতোয়ালী মডেল থানা-পুলিশের সদস্যরা অংশ নেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

অভিযানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নকল সিগারেট তৈরির একটি স্বয়ংক্রিয় মেশিন, বিপুল পরিমাণ সিগারেট এবং ইয়াবা তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে এমন সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ জব্দ করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

সূত্রের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, জব্দ করা সিগারেটের পরিমাণ—

  • নেভি (NAVY): ২৫ বস্তায় ১ হাজার ২০০ মাস্টার কার্টন, মোট ২ লাখ ৪০ হাজার শলাকা।

  • রয়েল (ROYAL): ৭ বস্তায় ৫৮৮ মাস্টার কার্টন, মোট ৫৮ হাজার ৮০০ শলাকা।

  • স্টার (STAR): ২ বস্তায় ১৬৮ মাস্টার কার্টন, মোট ১৬ হাজার ৮০০ শলাকা।

  • মনসুন (MANSUN): ২ বস্তায় ১০০ মাস্টার কার্টন, মোট ১০ হাজার শলাকা।

সব মিলিয়ে উদ্ধার করা সিগারেটের পরিমাণ ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ শলাকা। মাদক তৈরির সরঞ্জাম ও অন্যান্য জব্দ করা মালামালসহ এর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। তবে জব্দ করা মালামালের চূড়ান্ত তালিকা ও মূল্যায়নসংক্রান্ত সরকারি নথি পাওয়া গেলে প্রকৃত পরিমাণ ও মূল্য আরও নির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

জব্দ করা মালামালের মূল্য নিয়ে অসংগতিপূর্ণ বক্তব্যের অভিযোগ

অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার মো. ফিরোজ হোসেন বিশ্বাস সাংবাদিকদের বলেন, এসব তথ্য গণমাধ্যমকে জানানোর প্রয়োজন নেই এবং এ ধরনের অভিযান নিয়মিত পরিচালিত হয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে অভিযানে পুলিশকে সঙ্গে রাখা হয়েছিল।

জব্দ করা মালামালের মূল্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকার মালামাল উদ্ধারের কথা বলেন বলে সাংবাদিকদের দাবি। পরে উদ্ধার করা মালামালের পরিমাণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি ৫০ থেকে ৫৫ লাখ টাকার মতো হতে পারে বলে উল্লেখ করেন বলে প্রতিবেদকের ভাষ্য।

অন্যদিকে, অভিযানসংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া হিসাবে জব্দ করা মালামালের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। ফলে উদ্ধার করা পণ্যের প্রকৃত পরিমাণ, মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি এবং সরকারি জব্দতালিকার সঙ্গে বক্তব্যের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তবে এসব মূল্যায়নের পার্থক্যের কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

কারখানার মালিককে পালাতে সহায়তার অভিযোগ

অভিযানের সময় কারখানার মালিককে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি বলে সহকারী কমিশনার ফিরোজ হোসেন বিশ্বাস সাংবাদিকদের জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে স্থানীয় ও অভিযানসংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, কারখানার মালিক ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং পরে সেখান থেকে চলে যান।

এ ঘটনায় আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে মালিককে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে এ ধরনের লেনদেনের পক্ষে কোনো যাচাইযোগ্য নথি, প্রত্যক্ষ প্রমাণ কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটির সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

কারখানার মালিকের পরিচয়, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়েছে কি না এবং অভিযানের পর তাঁকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তথ্য চাইতে গিয়ে সাংবাদিকদের হয়রানির অভিযোগ

অভিযানের বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ময়মনসিংহের কার্যালয়ে যান স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, সহকারী কমিশনার ফিরোজ হোসেন বিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলার জন্য প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। পরে তিনি ব্যস্ততার কথা জানিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

সাংবাদিকদের দাবি, পরবর্তী সময়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য তাঁদের সহকারীর কাছে পাঠানো হয়। এরপর একতলা থেকে দোতলা, তিনতলা ও চারতলা হয়ে আবার অন্য কক্ষে এবং পাশের ভবনে যেতে বলা হয়। এভাবে দীর্ঘ সময় ঘোরাঘুরি করেও তাঁরা অভিযানের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথি বা সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।

গণমাধ্যমকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আচরণ রূঢ় হয়ে ওঠে এবং তাঁদের সঙ্গে অসম্মানজনক ব্যবহার করা হয়। সরকারি দপ্তরে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য জানতে গিয়ে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগে সাংবাদিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

কমিশনারের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা, মেলেনি আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া

অভিযানের তথ্য গোপন এবং সহকারী কমিশনারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ময়মনসিংহের কমিশনার এস. এম. সোহেল রহমানের বক্তব্য নিতে যান সাংবাদিকেরা।

প্রতিবেদকের ভাষ্য অনুযায়ী, কমিশনারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করার সময় সহকারী কমিশনার ফিরোজ হোসেন বিশ্বাস তাঁদের জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জরুরি সভায় যাবেন এবং এ মুহূর্তে কথা বলতে পারবেন না। পরে কমিশনারের একান্ত সচিবও ব্যস্ততার কথা জানিয়ে সাক্ষাৎ সম্ভব নয় বলে জানান।

পরবর্তীতে কমিশনারের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন প্রতিবেদক। ফলে অভিযানের তথ্য, জব্দ করা মালামালের মূল্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে কমিশনারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি

নকল সিগারেট উৎপাদন এবং মাদক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের মতো গুরুতর ঘটনায় জব্দ করা মালামালের সঠিক হিসাব, কারখানার মালিকের পরিচয়, অভিযানের পূর্ণাঙ্গ নথি এবং পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ জনসমক্ষে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযানে উদ্ধার করা পণ্যের সরকারি জব্দতালিকা, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, অভিযানের ভিডিও বা অন্যান্য নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে কারখানার মালিককে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি রাখে।

অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তাকে দোষী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।

খবর সারাক্ষণ | জনস্বার্থে সত্য ও নিরপেক্ষ সংবাদ


নিউজটি আপডেট করেছেন : Super Admin

কমেন্ট বক্স