সোহেল খান দূর্জয়, নেত্রকোনা প্রতিনিধি:
নদী-নালা, গ্রামগঞ্জ ও জনপদ ঘুরে জীবিকা নির্বাহ করাই বেদে সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের পরিচিত জীবনধারা। তবে সময়ের পরিবর্তনে তাদের ঐতিহ্যবাহী পেশার চাহিদা কমে আসায় জীবিকার সংকট আরও প্রকট হয়েছে। নেত্রকোনায় খোলা আকাশের নিচে তাঁবু খাটিয়ে বসবাস করা এই সম্প্রদায়ের অনেক পরিবারের কাছে এখন দুই বেলা খাবার জোগাড় করাই বড় চ্যালেঞ্জ। দারিদ্র্য, অনিশ্চিত জীবনযাপন ও শিক্ষার সুযোগের অভাবে তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎও পড়েছে অনিশ্চয়তায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নেত্রকোনা সদর উপজেলার ঠাকুরাকোনা, বারহাট্টা ও মোহনগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় মহাসড়কের পাশে কিংবা খোলা জায়গায় তাঁবু টানিয়ে বসবাস করছেন বেদে সম্প্রদায়ের লোকজন। তাদের অনেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব পরিবারের একটি বড় অংশ মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলা থেকে এসেছে।
বেদে সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পেশার মধ্যে রয়েছে সাপের খেলা দেখানো, বানরের খেলা প্রদর্শন এবং বিভিন্ন ধরনের তাবিজ বিক্রি। কেউ কেউ পুকুরে হারিয়ে যাওয়া স্বর্ণালংকার খোঁজার কাজও করেন। তবে সময়ের পরিবর্তনে এসব পেশার চাহিদা কমে যাওয়ায় তাদের আয়ও কমেছে। তারপরও পূর্বপুরুষদের পেশা আঁকড়ে ধরে কোনোরকমে দিন কাটাচ্ছেন অনেকে।
বেদে সম্প্রদায়ের সদস্যরা জানান, সাপের খেলা, বানরের খেলা ও তাবিজ বিক্রি করে আগে যে পরিমাণ আয় হতো, বর্তমানে তা আর হয় না। মানুষের আগ্রহ ও বিশ্বাস কমে যাওয়ায় এসব পেশা থেকে আয় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। সামান্য উপার্জনে খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। অনেক সময় প্রয়োজনীয় খাবারও জোটে না।
রবিবার (১ নভেম্বর) সকালে ঠাকুরাকোনা, বারহাট্টা ও মোহনগঞ্জ এলাকায় বেদে সম্প্রদায়ের বসবাসস্থল ঘুরে দেখা যায়, জীবিকার সন্ধানে পরিবারের কেউ কেউ সকালেই বেরিয়ে পড়েছেন। গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সাপের খেলা দেখানো, বানরের খেলা প্রদর্শন ও তাবিজ বিক্রির মাধ্যমে উপার্জনের চেষ্টা করছেন তারা।
অন্যদিকে তাঁবুতে থাকা শিশুদের অনেকেই সকালের খাবার হিসেবে খাচ্ছিল সাদা ভাত ও সবজি। খাবারে মাছ-মাংসের মতো পুষ্টিকর উপাদানের উপস্থিতি ছিল না। সীমিত আয়ের কারণে প্রয়োজনীয় পুষ্টি, পোশাক, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না অনেক অভিভাবক।
দারিদ্র্য ও স্থায়ী আবাসনের অভাব বেদে সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক জায়গায় স্থায়ীভাবে বসবাস না করায় অনেক শিশুর নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে শৈশব থেকেই পরিবারের সঙ্গে জীবিকার কাজে যুক্ত হতে হচ্ছে তাদের।
নেত্রকোনা সদর উপজেলার ঠাকুরাকোনায় বসবাসরত বেদে সম্প্রদায়ের শিশু সাজিরুলের বয়স ৯ বছর। নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে সে জানায়, তাদের সংসারে নিয়মিত দুই বেলা খাবার জোটে না। তার মা সারা দিন কাজ করে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় করেন। সেই টাকা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন।
সাজিরুল বলে, “লেখাপড়া করার খুব ইচ্ছা হয়। কিন্তু দুই বেলা খাবারই ঠিকমতো জোটে না। তাঁবুতে থাকি, ভালো জামাকাপড়ও নেই। কোনো দিন শুধু ভাত আর সবজি খেয়ে থাকি, আবার কোনো দিন খাবারও জোটে না। পরিবারের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে হয় বলে স্কুলে যাওয়ার সুযোগও হয় না।”
একটি শিশুর এমন বক্তব্য বেদে সম্প্রদায়ের অনেক পরিবারের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যেখানে অন্য শিশুরা বিদ্যালয়ে গিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখছে, সেখানে জীবনধারণের সংগ্রামেই দিন কাটছে অনেক বেদে শিশুর।
ঠাকুরাকোনায় বসবাসরত বেদে সম্প্রদায়ের ষাটোর্ধ্ব এক সর্দার, যিনি প্রতিবেদনে কামরুল নামে উল্লেখিত, জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের মতো অনেক পরিবার খোলা আকাশের নিচে তাঁবুতে বসবাস করছে। বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেই তারা জীবন পার করছেন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই পেশা দিয়ে পরিবারের চাহিদা পূরণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
বেদে সম্প্রদায়ের নূপুর বেগম (৩৫) বলেন, তাদের নিজস্ব জায়গাজমি নেই। স্থায়ীভাবে বসবাসের জায়গা না থাকায় সন্তানদের পড়াশোনা করানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি চান, সরকার তাদের বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে দিক, যাতে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো সম্ভব হয়।
নূপুর বেগমের ভাষায়, তারা চান না তাদের সন্তানরাও বাধ্য হয়ে পূর্বপুরুষদের একই পেশায় যুক্ত হোক। বরং সন্তানরা লেখাপড়া শিখে অন্য পেশায় প্রতিষ্ঠিত হোক—এটাই তাদের প্রত্যাশা।
বেদে সম্প্রদায়ের জীবনসংগ্রাম শুধু দারিদ্র্যের চিত্র নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি ও স্থায়ী আবাসনের সুযোগ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরে। তাদের জীবনমান উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশেষ করে শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি ও নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পরিবারগুলোর জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, পুষ্টি সহায়তা এবং স্থায়ী বা নিরাপদ আবাসনের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা করা গেলে পরিবারগুলো ধীরে ধীরে ঐতিহ্যনির্ভর অনিশ্চিত জীবিকা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেতে পারে।
বেদে সম্প্রদায়ের মানুষও অন্য সবার মতো সম্মানজনক জীবন, নিরাপদ আশ্রয় এবং সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ চান। তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
Super Admin