ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ময়মনসিংহে খাদ্য অফিসের ‘ছায়া নিয়ন্ত্রক’ জাকির (পর্ব-৩)

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 15, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন:
​ডিলার জিম্মি করে দিনে ৩০ হাজার, বছরে কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য: অপারেটর জাকিরের টেবিলেই আটকা খাদ্য অফিস

​নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ:

​নিয়োগবিধি অনুযায়ী তিনি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন তৃতীয় শ্রেণির একজন সাধারণ কর্মচারী—কম্পিউটার অপারেটর। নাম জাকির হোসেন। তবে ময়মনসিংহের জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে দাপ্তরিক পদবি ছাপিয়ে কার্যক্ষেত্রে তিনি এখন অলিখিত ‘ছায়া নিয়ন্ত্রক’। ডিলারদের ফাইল অনুমোদন, মাস্টাররোল প্রস্তুত এবং খাদ্যগুদামের ডেলিভারি অর্ডার (ডিও) প্রক্রিয়াকরণকে পুঁজি করে তিনি গড়ে তুলেছেন বেপরোয়া ঘুষের সিন্ডিকেট। প্রতিদিন অফিসে ঢোকা ও বের হওয়ার পথেই বিভিন্ন খাদ্য ডিলারের কাছ থেকে তাঁর পকেটে ঢুকছে অন্তত ৩০ হাজার টাকা। সেই হিসাবে মাসে প্রায় ৯ লাখ এবং বছরে এই অবৈধ আয়ের অঙ্ক ছাড়িয়ে যাচ্ছে কোটি টাকা।

​ওএমএস, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং নিয়মিত খাদ্যশস্য ডিলারদের অভিযোগ, জাকির হোসেনকে এই নির্ধারিত বখরা না দিলে নথিপত্রে ইচ্ছাকৃত ভুল ও কাটাকাটি তৈরি করে বরাদ্দ আটকে রাখা হয়। এমনকি এলএসডি (স্থানীয় সরবরাহ ডিপো) বা গুদাম থেকে ভালো মানের চাল-গম বরাদ্দের বদলে ধরিয়ে দেওয়া হয় পচা ও নিম্নমানের খাদ্যশস্য। লোকসান ও নানামুখী প্রশাসনিক হয়রানি এড়াতে বাধ্য হয়েই ডিলাররা প্রতিদিন তাঁর হাতে এই নগদ অর্থ তুলে দিচ্ছেন।

​জাকিরের ঘুষ আদায়ের সুনির্দিষ্ট ছক

​ফাইলপ্রতি বাধ্যতামূলক বখরা: তালিকাভুক্ত অন্তত ৪০ জন ডিলারের ফাইল ছাড় ও নিয়মিত বরাদ্দ প্রক্রিয়াকরণের নামে ফাইলপ্রতি ২০০ টাকা করে আদায় করা হয়।

ট্রাকসেল ডিলারদের দৈনিক নজরানা: খোলাবাজারে ট্রাকে চাল ও আটা বিক্রির ডিলারদের কাছ থেকে গাড়িপ্রতি এককভাবে দৈনিক নেওয়া হয় ৫০০ টাকা। টাকা দিতে সামান্য দেরি হলেই নথিপত্র আটকে চরম ভোগান্তিতে ফেলা হয়।

​তদারকি কর্মকর্তাদের ‘স্পট বাণিজ্য’: ডিলারদের পণ্য সঠিকভাবে বণ্টন হচ্ছে কি না, তা তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের লাভজনক ও সুবিধাজনক পয়েন্ট বা স্পটে দায়িত্ব দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মাসিক চুক্তিতে অর্থ হাতিয়ে নেন তিনি। শীর্ষ কর্মকর্তাদের নাম ভাঙানো: জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করার দোহাই দিয়ে জাকির নিয়মিত অর্থ দাবি করেন। ডিলারদের সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়—‘বড় স্যারের টেবিল ঠান্ডা না রাখলে ফাইল সই হবে না’।

​ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব

​নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ডিলার জানান, ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই তাঁরা জাকিরের এই অনৈতিক দাবি মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে এক ডিলার বলেন, “আমরা সরকারের খাদ্যশস্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এসে সামান্য এক কম্পিউটার অপারেটরের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছি। দিনে ৩০ হাজার টাকার নিচে তার কালেকশন নামে না। গাড়িতে যারা বিক্রি করে তাদের কাছ থেকে ৫০০ এবং সাধারণ ফাইলপ্রতি ২০০ টাকা না দিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রেখে সময়ক্ষেপণ করা হয়। প্রতিবাদ করলে বড় স্যারদের নাম ভাঙিয়ে লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দেয় সে।”

​আরেক ভুক্তভোগী ডিলার বলেন, “অফিসের শীর্ষ কর্তারা এসবের ভাগ পান কি না তা খতিয়ে দেখার বিষয়, তবে মূল কারসাজি ও ব্ল্যাকমেইলিংটা হয় এই অপারেটরের টেবিলেই।”

​আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি ১৯৭৯ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন অনুযায়ী, কোনো কর্মচারীর এ ধরনের চাঁদাবাজি, দাপ্তরিক নথিপত্র জিম্মি করা ও ক্ষমতার অপব্যবহার সরাসরি গুরুতর অসদাচরণ ও শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। যা বললেন অভিযুক্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ

​অভিযুক্ত কম্পিউটার অপারেটর জাকির হোসেন:

অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের কম্পিউটার অপারেটর জাকির হোসেনের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।

​ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মাহমুদুল হাছান:

“অপারেটর জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে ডিলারদের জিম্মি করে টাকা আদায়ের বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। তবে অভিযোগ পেলে এবং সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে কঠোর বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খাদ্য বিভাগের কোনো স্তরেই অনিয়ম বা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। (চলবে... আগামী পর্বে পড়ুন: জাকিরের কোটি টাকার সম্পদের উৎস কী? নামে-বেনামে কোথায় গড়েছেন সম্পদের পাহাড়—অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পর্ব-৪)

নিউজটি আপডেট করেছেন : Khobor Sarakkhon

কমেন্ট বক্স