বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক খবর সারাক্ষণ: জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নুর ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে কানাডায় বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন, একাধিক কোম্পানির মালিকানা এবং দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) এবং আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট দীর্ঘ এক দশক ধরে চলা এসব আর্থিক লেনদেনের তথ্য খতিয়ে দেখছে।
সম্প্রতি রাজধানীর দক্ষিণ মানিকদীতে নিউ গিনি প্রপার্টিজের প্রকল্প এলাকায় সালমান মুক্তাদিরের নিজস্ব স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনার পর বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। তবে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান তদন্তটি সাম্প্রতিক ওই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং চলতি বছরের এপ্রিল থেকেই অর্থ পাচার, কর ফাঁকি ও শুল্ক অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে সমন্বিতভাবে অনুসন্ধান চালাচ্ছে একাধিক সংস্থা।
১০ বছরের লেনদেন ও সন্দেহজনক খতিয়ান
কানাডা থেকে সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দাদের সংগ্রহ করা নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১২ সালের ২৬ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত নুর ইসলাম ও তার পরিবারের আর্থিক গতিবিধির মোট ১৬৩টি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
* ১৭টি ‘সন্দেহজনক’ লেনদেনের নথি
* ২টি ‘সন্দেহজনক’ লেনদেনের চেষ্টার প্রমাণ
* ১১৮টি ‘বড় অঙ্কের’ নগদ লেনদেন
* ২৬টি ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক (ইএফটিএন) ট্রান্সফার
* ২টি আন্তদেশীয় অর্থ লেনদেনের রেকর্ড
হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, পরিবারটির সম্মিলিত লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ লাখ ৮৯ হাজার ৬২৯ কানাডিয়ান ডলারে (অন্যান্য আন্তর্জাতিক মুদ্রাসহ)। এছাড়া মাত্র এক বছরেই প্রায় ৯৫ কোটি টাকা রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে আনার তথ্য মিলেছে।
কানাডায় চার কোম্পানি ও নাগরিকত্ব
কানাডার গোয়েন্দা প্রতিবেদনে মূল ব্যক্তি হিসেবে নাম রয়েছে শেখ নুর ইসলাম, তার স্ত্রী শীলা ইসলাম এবং তাদের দুই মেয়ে দিশা ইসলাম (সালমান মুক্তাদিরের স্ত্রী) ও তাসনিম ইসলামের। নথিতে তাদের সবাইকে ‘শেখ নুর ম্যানেজমেন্ট ইনকর্পোরেটেড’-এর পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া নুর ইসলামকে ‘১৭৭১০৬৯ অন্টারিও ইনকর্পোরেটেড’-এর পরিচালক ও প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দেখানো হয়েছে। নথিতে নুর ইসলাম ও তাসনিম ইসলামের কানাডার নাগরিকত্ব থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
তাদের সহযোগী হিসেবে ‘১৭৭১০৬৯ অন্টারিও ইনকর্পোরেটেড’-এর পরিচালক গাজী হোসেন এবং কোম্পানিটির সেক্রেটারি ও ট্রেজারার আবুল কালাম আজাদ চৌধুরীর নাম এসেছে। কানাডার ব্যাংকগুলোতে তাদের ব্যক্তিগত, যৌথ এবং কোম্পানির নামে একাধিক সক্রিয় অ্যাকাউন্ট ও বন্ধকী (মর্টগেজ) ঋণের অস্তিত্ব রয়েছে।
দেশে সম্পদের উল্লম্ফন ও দেশীয় ব্যবসা
শেখ নুর ইসলামের দেশীয় আয়কর নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ করবর্ষে যেখানে তার মোট সম্পদ ছিল সোয়া ১৪ কোটি টাকা, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪ কোটি টাকায়। এই বৃদ্ধির সিংহভাগ—প্রায় ৯৫ কোটি টাকা—দেখানো হয়েছে রেমিট্যান্স হিসেবে।
দেশে নুর ইসলামের মালিকানাধীন বা পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে:
* কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউজ: গুলশানের ‘টস বন্ড’ (শুল্কমুক্ত পণ্য খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে)।
* ক্লাব ও রেস্তোরাঁ: তেজগাঁও লিংক রোডের বহুল আলোচিত ‘ফুওয়াং ক্লাব’ ও ‘কয়লা রেস্টুরেন্ট’।
* অন্যান্য ব্যবসা: বর্ষা মানি চেঞ্জিং সেন্টার, বর্ষা ডেইরি ফার্ম, বর্ষা ফিশারিজসহ ডমিনোজ পিৎজা, ফুওয়াং বোলিং, ইস্টার্ন হোটেল অ্যান্ড বার, রেডিও মাসালা, স্পাইস টেলিভিশন, স্টারবাকস ক্যাফে ও টিম হর্টনসসহ অন্তত ১৪টি লিমিটেড কোম্পানি।
তবে তার দাখিল করা আয়কর নথিতে কানাডার নাগরিকত্ব, সেখানকার কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা ঢাকার ‘টস বন্ড’-এর কোনো তথ্য বা শেয়ারের উল্লেখ নেই।
যৌথ তদন্ত ও অনুসন্ধান
এনবিআর ও আয়কর গোয়েন্দা সূত্র জানায়, কেবল আয়কর নয়; বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, ভ্যাট ও আমদানির শুল্ক ফাঁকির মতো বিষয়গুলো জড়িত থাকায় আয়কর গোয়েন্দা, শুল্ক গোয়েন্দা ও ভ্যাট গোয়েন্দা যৌথভাবে কাজ করছে। প্রাপ্ত সামগ্রিক তথ্য আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকেও (বিএফআইইউ) সরবরাহ করা হয়েছে।
বক্তব্যে রহস্যজনক বিভ্রান্তি
কর নথিতে তথ্য গোপনের বিষয়ে জানতে শেখ নুর ইসলামের আয়কর নথিতে দেওয়া মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে ফোনটি একজন অজ্ঞাত ব্যক্তি রিসিভ করেন। তিনি নিজেকে ‘ড্রাইভার’ পরিচয় দিয়ে দাবি করেন, তিনি নুর ইসলামকে চেনেন না এবং তার ব্যক্তিগত নম্বরটি কীভাবে এক ব্যবসায়ীর কর নথিতে যুক্ত হলো তা তার জানা নেই। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট কর কর্মকর্তাদের মাধ্যমে যাচাই করে দেখা যায়, নথিতে ওই নম্বরটিই আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের একাধিক প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও শেখ নুর ইসলামের বিকল্প কোনো সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে নুর ইসলামের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য জানতে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে দৈনিক খবর সারাক্ষণ।