ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, বুধবার জর্ডানে থাকা একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। একই দিনে হরমুজ প্রণালিতে ১০টি জাহাজেও হামলা চালানোর দাবি করেছে তারা।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার কথা জানিয়েছিল। পরপর এসব হামলার ঘটনায় কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাত নতুন করে বড় ধরনের উত্তেজনার দিকে এগোচ্ছে। প্রায় এক মাস পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকার পর গত কয়েক দিনে আবারও দুই পক্ষের সামরিক তৎপরতা বেড়েছে।
আইআরজিসির ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে লক্ষ্যবস্তু করা ১০টি জাহাজের মধ্যে দুটি মার্কিন এবং বাকি আটটি তেলবাহী ট্যাংকার। ইরানের দাবি, এসব জাহাজ হরমুজ প্রণালির একটি নির্ধারিত ‘নিষিদ্ধ ও অনিরাপদ’ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করছিল।
ইরানের হামলার কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত ব্যাহত হয়েছে। এই পরিস্থিতির প্রভাব ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে শুরু করেছে।

পাঁচ ইরানি ট্যাংকারে মার্কিন হামলা
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা ইরানের পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, এর মধ্যে চারটি ট্যাংকারকে ওমান উপসাগরে এবং অন্য একটি ট্যাংকারকে ইরানের খারগ দ্বীপের কাছে লক্ষ্য করা হয়।
খারগ দ্বীপ ইরানের তেল রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র। দেশটির মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির বড় অংশ এই দ্বীপের অবকাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
সেন্টকমের দাবি, হামলার শিকার ট্যাংকারগুলো আইআরজিসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বৃহৎ তেল নেটওয়ার্কের অংশ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, এই নেটওয়ার্ক থেকে পাওয়া অর্থ ইরানের বিপ্লবী গার্ড ও তাদের আঞ্চলিক সহযোগীদের কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়।
জর্ডানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
মার্কিন হামলার জবাবে ইরান জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে বলে জানিয়েছে আইআরজিসি।
জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ২০টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে। বাকি দুটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন এলাকায় গিয়ে পড়ে বলে দাবি করেছে দেশটি।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে তেহরানের হামলা হয়েছে। এর মধ্যে জর্ডানও একাধিকবার হামলার মুখে পড়েছে।
যুদ্ধের উত্তেজনায় বাড়ছে তেলের দাম
দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। এশিয়ার বাজারে বুধবার দিনের শুরুতেই অপরিশোধিত তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৪১ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে লেনদেন হওয়া অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৪ দশমিক ৫৫ ডলারে ওঠে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি হওয়ায় এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।
আরও হামলার হুঁশিয়ারি তেহরানের
এরই মধ্যে ইরান আরও প্রতিশোধমূলক হামলার সতর্কবার্তা দিয়েছে। কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দরের আশপাশে থাকা যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট তেলবাহী জাহাজের নাবিকদের দ্রুত জাহাজ ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছে তেহরান। এসব জাহাজ ভবিষ্যতে হামলার লক্ষ্য হতে পারে বলে সতর্ক করেছে তারা।
এর আগে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার দাবি করেছিল। তবে সেন্টকম জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে এবং ওই ঘটনায় কোনো মার্কিন সেনা আহত হননি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরান মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে হামলার চেষ্টা চালিয়ে গেলে প্রতিবারই তেহরানের তেলবাহী জাহাজ ক্ষতির মুখে পড়বে।

হরমুজে মার্কিন সাবমেরিন ড্রোন নিয়ে নতুন দাবি
উত্তেজনার মধ্যেই মঙ্গলবার ইরান একটি মার্কিন চালকবিহীন সাবমেরিন জব্দ করার দাবি করেছিল। ইরানের নৌবাহিনী জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখ থেকে সাবমেরিন ড্রোনটি তাদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ড্রোনটি আগেই বিকল হয়ে পড়েছিল। সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানান, পানির নিচের ওই ড্রোনটি আঞ্চলিক জলসীমা পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছিল এবং চলমান সামরিক অভিযানে সহায়তা করছিল।
মার্কিন কর্মকর্তার দাবি, এটি পুরোনো মডেলের একটি ড্রোন এবং এতে সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা বা গোপনীয় কোনো সরঞ্জাম ছিল না।
সব মিলিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আবারও বড় ধরনের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় এর প্রভাব আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।
Super Admin