ঢাকা | বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামের যানজট কমাতে সমন্বিত উদ্যোগ, বিকেন্দ্রীকরণের প্রস্তাব

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 11, 2026 ইং
চট্টগ্রাম নগরের যানজট নিরসন ও পরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ে চউকের সমন্বয় সভায় বক্তব্য দেন চউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন। ছবির ক্যাপশন: চট্টগ্রাম নগরের যানজট নিরসন ও পরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ে চউকের সমন্বয় সভায় বক্তব্য দেন চউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন।
ad728

মোহাম্মদ দিদারুল ইসলাম

বিশেষ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম নগরের যানজট কমাতে পার্কিং ব্যবস্থার উন্নয়ন, আধুনিক গণপরিবহন চালু, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নগরের কেন্দ্র থেকে প্রান্তিক এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। একই সঙ্গে আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল নির্মাণ বন্ধ, পর্যাপ্ত খোলা জায়গা সংরক্ষণ এবং ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) সাম্প্রতিক পরিদর্শনের পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে, তা পর্যালোচনা এবং নগরের যানজট, দূষণ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় সভা করেছে চউক।

বৃহস্পতিবার চউক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন চউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন। সভায় চউকের পরিদর্শনের আওতাভুক্ত ২০টি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, চারটি স্কুল ও দুটি সুপারশপের প্রতিনিধির পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরসহ (মাউশি) বিভিন্ন সরকারি সেবাদানকারী সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

পার্কিং ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের উদ্যোগ

সভায় হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধিরা জানান, চউকের পরিদর্শনের পর প্রতিষ্ঠানগুলোতে পার্কিং সুবিধা বাড়ানো, ড্রপিং বে উন্নয়ন, রোগী ওঠানামার জন্য নির্ধারিত স্থান তৈরি এবং পার্কিং ব্যবস্থাপনা উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পার্কিংয়ের জন্য নতুন জায়গা কেনা বা ভাড়া নেওয়ার কথাও জানিয়েছে।

যানজট কমাতে চউক, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করেন তারা।

স্কুলকেন্দ্রিক যানজট কমানোর উদ্যোগ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা জানান, স্কুলকেন্দ্রিক যানজট কমাতে বিভিন্ন শ্রেণির পাঠদান ভিন্ন সময়ে শুরু ও শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের জন্য নিজস্ব বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।

স্কুলের সামনে যানজট নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা বাড়ানো এবং নিজস্ব ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদারের কথাও জানান তারা। শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সড়ক পারাপারের জন্য কয়েকটি স্কুলের পক্ষ থেকে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের দাবি জানানো হয়।

নগর বিকেন্দ্রীকরণের প্রস্তাব

সভায় সরকারি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা বলেন, শুধু যানজট নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিলেই হবে না; নগরের সামগ্রিক পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নগরের কেন্দ্র থেকে প্রান্তিক এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

পাশাপাশি আধুনিক কিচেন মার্কেট, হাইরাইজ পার্কিং এবং আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবও আসে।

আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল নির্মাণ না করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। নগরের ফুটপাত ও সড়ক জনসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা, অবৈধ দখলমুক্ত করা এবং পর্যাপ্ত খোলা জায়গা সংরক্ষণের ওপর জোর দেন অংশগ্রহণকারীরা।

সভায় বলা হয়, যানজট কমাতে চউক, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শুধু সড়ক সম্প্রসারণ করে নগরের যানজটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ভবনের ব্যবহার, পার্কিং, গণপরিবহন, ফুটপাত, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নগর পরিকল্পনাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।

অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন ব্যবহার নয়

সভায় ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। চউকের অনুমোদিত নকশা এবং ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদিত ফায়ার সেফটি প্ল্যান অনুসরণ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

যে উদ্দেশ্যে ভবনের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে, ভবনটি সেই উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করতে হবে বলে সভায় মত দেন অংশগ্রহণকারীরা।

চউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, নগরের সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। চউকের পরিদর্শনের পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা আশাব্যঞ্জক।

সমাপনী বক্তব্যে চউক চেয়ারম্যান বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নির্দেশনায় নগরকে যানজট, দূষণমুক্ত, নান্দনিক ও বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে আমি কাজ করে যাচ্ছি। আমি থামবার পাত্র নই। যতদিন আমি এই চেয়ারে আছি, এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করে যাব।”

তিনি বলেন, “আমরা এই পরিদর্শনে বিভিন্ন মতামত দিয়েছি। একদিনে হয়তো সমস্যার সমাধান হবে না। দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধান আছে চউক কর্তৃক প্রণীত মাস্টার প্ল্যান (২০২৫–৫০) বাস্তবায়নের মাধ্যমে। এর পাশাপাশি আমরা স্বল্পমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি বিভিন্ন সমাধানের পথও দেখছি।”

চউক চেয়ারম্যান আরও বলেন, “ইতোমধ্যে যে সকল অগ্রগতি দেখেছি তা চোখে পড়ার মতো। আমরা যদি একসঙ্গে চেষ্টা করি, তাহলে অবশ্যই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।”

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ২০২৫–২০৫০ মেয়াদি নতুন মহাপরিকল্পনাটি বর্তমানে খসড়া পর্যায়ে রয়েছে এবং এতে নগরের পরিধি বাড়ানো ও পরিকল্পিতভাবে উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

সভায় অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা নগরের যানজট, দূষণ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ কমাতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কার্যকর ভূমিকা রাখার কথা জানান। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সমন্বিতভাবে নগরের সমস্যার সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সভায় ল্যানসেট হাসপাতাল, আল-হিদায়াহ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, রয়েল হাসপাতাল, ন্যাশনাল হাসপাতাল, পার্কভিউ হাসপাতাল, ম্যাক্স হাসপাতাল, সিএসসিআর, ইবনে সিনা হাসপাতাল, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, চট্টগ্রাম গ্রামার স্কুল, চট্টগ্রাম আইডিয়াল স্কুল ও উৎসব সুপার মার্কেটের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

এ ছাড়া সভায় সেবাদানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের মধ্যে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (স্টেট) এ বি ছিদ্দিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আব্দুস সালাম, চউক বোর্ড সদস্য ও পরিবেশবিদ স্থপতি জেরিনা হোসাইন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. শেখ ফজলে রাব্বি উপস্থিত ছিলেন।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পক্ষে সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল, সদস্য (ইঞ্জিনিয়ারিং ও পরিকল্পনা) মো. জামিলুর রহমান এবং সদস্য (অর্থ ও প্রশাসন) মোহাম্মদ নূরুল্লাহ নূরী।


নিউজটি আপডেট করেছেন : Super Admin

কমেন্ট বক্স