সোহেল খান দূর্জয়, নেত্রকোনা:
নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় একের পর এক চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার পর মামলা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তদন্তের অগ্রগতি, আসামিদের গ্রেপ্তার এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো মামলায় বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও হত্যার রহস্য পুরোপুরি উদ্ঘাটিত হয়নি।
সর্বশেষ গত ১৫ অক্টোবর সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফকে গুলি করে হত্যার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর তিন দিন পর, ১৮ অক্টোবর মোহনগঞ্জে আরেক ব্যক্তিকে গুলি করার ঘটনা ঘটে। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
গত বছরের ১১ নভেম্বর দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। দুপুর ১টার দিকে আলিফ ও তাঁর সহকর্মী শাহজাহান শেখ সোমেশ্বরী নদী পার হওয়ার জন্য ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলে তেরিবাজার ঘাটে পৌঁছান। এ সময় দুটি মোটরসাইকেলে চারজন ব্যক্তি সেখানে আসেন। তাঁদের মধ্যে দুজন চাপাতি দিয়ে আলিফকে এলোপাতাড়ি কোপান।
এতে তাঁর দুই হাত, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম হয়। সহকর্মী শাহজাহান শেখ বাধা দিতে গেলে তাঁকেও হামলার চেষ্টা করা হয়। পরে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যান।
আহত আলিফকে প্রথমে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি সুস্থ হন।
ঘটনার পর একই বছরের ২৯ নভেম্বর জেলা পুলিশের তৎকালীন পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেখানে আলিফ নিজের ওপর হামলা এবং ভবিষ্যতে হত্যার আশঙ্কার কথা পুলিশ সুপারকে জানিয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এর প্রায় এক বছর পর গত ১৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় শ্বশুরবাড়ির পাশের একটি চায়ের দোকানে তাঁকে পরপর ছয়টি গুলি করে হত্যা করা হয়।
নেত্রকোনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের চিকিৎসক শ্রদ্ধ্যানন্দ নাথের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আলিফের বুকে তিনটি গুলির আঘাত ছিল। এর মধ্যে দুটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায় এবং একটি পিঠের দিকে শরীরের ভেতরে আটকে ছিল। বাকি তিনটি গুলির মধ্যে একটি কপালের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। অন্য দুটি গুলি মাথার ওপরের অংশ ও ডান কাঁধের পাশের চামড়া ভেদ করে যায়।
চিকিৎসক জানান, শরীরে গুলির প্রবেশ ও বের হওয়ার চিহ্ন পর্যবেক্ষণ করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আলিফকে সামনে থেকে গুলি করা হয়েছিল।
২০১৫ সালের ২৩ অক্টোবর দুর্গাপূজার শেষ দিন ভোর থেকে বেলা ১টার মধ্যে নিজ বাসার তৃতীয় তলার একটি কক্ষে খুন হন ব্যবসায়ী অরুণ কুমার সাহা (৭৪) ও তাঁর স্ত্রী হেনা রানী সাহা (৬৫)।
অরুণ কুমার সাহা দুর্গাপুর পৌরশহরের মধ্যবাজার এলাকায় 'সুবর্ণা প্লাজা' নামের তিনতলা মার্কেট ও সেখানকার সুবর্ণা বস্ত্রালয়ের মালিক ছিলেন। স্ত্রীকে নিয়ে তিনি ওই মার্কেটের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন।
তাঁদের দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে ছোট ছেলে সুদীপ কুমার সাহা ও মেয়ে সুলেখা সাহা ইতালিতে এবং বড় মেয়ে সুবর্ণা সাহা কানাডায় থাকেন। বড় ছেলে সুজিত কুমার সাহা মা-বাবার সঙ্গে থাকতেন। তাঁর স্ত্রী দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করতেন।
ঘটনার আগের দিন সুজিত মা-বাবাকে বাসায় রেখে ঢাকায় যান। পরদিন সকালে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে পাশের বাসার স্বজনদের খোঁজ নিতে বলেন। একপর্যায়ে অজিত কুমারের স্ত্রী সুচিত্রা অরুণের বাসার দরজা খোলা দেখতে পেয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে পৃথক দুটি কক্ষে অরুণ ও হেনা রানীর গলা কাটা ও ক্ষতবিক্ষত মরদেহ দেখতে পান।পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা একাধিকবার পরিবর্তন করা হয়। প্রথমে দুর্গাপুর থানা-পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও ২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তর করা হয়।
সিআইডি তদন্তভার নেওয়ার পর তিনবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করে। সংস্থাটির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার শংকর কুমার দাস ২০১৭ সালের শেষ দিকে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
তখন তিনি বলেছিলেন, হত্যাকাণ্ডের এক বছর পর তিনি তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় অনেক আলামত নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ঘটনাস্থলের প্রয়োজনীয় আলামত সংরক্ষিত না থাকায় তদন্তে জটিলতা তৈরি হয়। সন্দেহভাজন কয়েকজনের মুঠোফোনের কল রেকর্ডও পাওয়া যায়নি।
পরবর্তী সময়ে বাদী আদালতে নারাজি আবেদন করলে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে মামলাটি পুনঃতদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)।
পিবিআইয়ের পাঁচজন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের পর সর্বশেষ পরিদর্শক অভি রঞ্জন দেব তদন্ত করেন। তিনি ২০২৪ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে দুর্গাপুর চৌকি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধস্থলসহ প্রয়োজনীয় আলামত সংরক্ষণ না করায় তদন্তে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল।
২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি দুর্গাপুরে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শফিকুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
ওই দিন ছুটিতে এসে পৌর শহরের বাগিচাপাড়া এলাকার বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। সন্ধ্যা সোয়া ৬টার পর পানমহাল রোড এলাকায় হেঁটে যাওয়ার সময় কয়েকজন দুর্বৃত্ত দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁর ওপর হামলা চালায়।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে রাত সাড়ে ৯টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ছয়জনকে আসামি করে মামলা করেন। হত্যাকাণ্ডের একটি সিসিটিভি ফুটেজে তিনজন যুবককে শফিকুলের ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা করতে দেখা যায়।
ঘটনার পর পিবিআইয়ের ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা কার্যালয়ের যৌথ অভিযানে দুই যুবক সাজিবুল ইসলাম (২৮) ও মো. বাকী বিল্লাহ (৩০) গ্রেপ্তার হন। পরে তাঁরা জামিনে মুক্তি পান।
নিহত শফিকুল ইসলাম দুর্গাপুর উপজেলার চণ্ডীগড় ইউনিয়নের নয়াগাঁও গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে। তিনি জামালপুর পুলিশ লাইনসে বেতার বিভাগে উপপরিদর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
২০২২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে দুর্গাপুরের কুল্লাগড়া ইউনিয়নের রাশিমনি বাজারে হামলার শিকার হন ইউপি চেয়ারম্যান সুব্রত সাংমা। আধিপত্য বিস্তার ও পূর্ববিরোধের জেরে এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, উপজেলা বিএনপির তৎকালীন সদস্যসচিব আবদুল আওয়ালের ভাই মো. শামিম আহমেদ ওরফে শুটার শামীমের নেতৃত্বে এ হামলা চালানো হয়। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে ওই রাতেই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
পরদিন রাতে সুব্রত সাংমার বোন কেয়া সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় মামলা করেন। মামলায় ইউপি চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আবদুল আওয়াল, তাঁর ভাই শামিম, মো. বদিউজ্জামানসহ ১৫ জনকে আসামি করা হয়। মামলার পর আসামিরা আদালত থেকে আগাম জামিন নেন বলে জানা গেছে। ২০২৪ সালে দুর্গাপুরে আধিপত্য বিস্তার ও পূর্ববিরোধের জেরে মজিবর রহমান (৫১) ওরফে দা মজিবরকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে।
তিনি দুর্গাপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বিরিশিরি ইউনিয়নের নলজোরা গ্রামের মৃত সুরুজ আলীর ছেলে। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, মারামারি ও সীমান্তে চোরাচালান-সংক্রান্ত প্রায় ১২টি মামলা ছিল।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রের দাবি, শামিম মিয়া (৩৩) ওরফে শুটার শামিমের সঙ্গে মজিবরের সীমান্তে চোরাচালান ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল।
ঘটনার দিন সকালে সুসং সরকারি মহাবিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মজিবরের ভাতিজার সঙ্গে কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল আওয়ালের ছেলের ঝগড়া হয়। এর জের ধরে দুপুরে দক্ষিণ ভবানীপুর এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে গুরুতর আহত মজিবরকে স্থানীয় লোকজন দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে নেত্রকোনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) রেজওয়ান আহমেদ বলেন, ঘটনাস্থলে পুলিশের একাধিক ইউনিটের পাশাপাশি বিশেষায়িত টিম কাজ করছে।
অন্যদিকে, সাংবাদিক আলিফ হত্যার বিষয়ে নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, আলিফ হত্যার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তদন্তের মাধ্যমে তাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
তিনি আরও বলেন, সীমান্তে চোরাচালান, মাদকসহ সব ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দুর্গাপুরে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, পুরোনো মামলার দীর্ঘসূত্রতা, তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন এবং কোনো কোনো মামলায় আলামত সংরক্ষণে ঘাটতির তথ্য জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে পুরোনো অমীমাংসিত মামলাগুলোর তদন্তের অগ্রগতি প্রকাশ এবং বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
Super Admin