
মাহিদুল ইসলাম ফরহাদ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি
চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ৭০টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে জেলায় মোট ১৮১টি অপমৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আত্মহত্যার ঘটনায় কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জেলা পুলিশ।
জেলা পুলিশের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জে মোট ১৮১টি অপমৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়। এর মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা ৭০টি।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আত্মহত্যার ঘটনায় ১৮ বছরের নিচে ১৫ জন, ১৯ থেকে ৩০ বছর বয়সী ২৯ জন, ৩১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ১২ জন, ৪৬ থেকে ৬০ বছর বয়সী ৯ জন এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সী ৫ জন রয়েছেন।
পুলিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রেমঘটিত বিষয়, পরীক্ষায় ব্যর্থতা, অভিমান, পারিবারিক অশান্তি, দাম্পত্য কলহ, মানসিক চাপ, আর্থিক সংকট ও ঋণের বোঝাসহ বিভিন্ন পরিস্থিতি আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের ক্ষেত্রে সাময়িক মানসিক চাপ গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছে পুলিশ।
পরিসংখ্যানে নারীদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য বলে জানিয়েছে জেলা পুলিশ। পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য অসন্তোষ, মানসিক চাপ ও সামাজিক নানা প্রত্যাশার কারণে নারীদের একটি অংশ ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। পাশাপাশি আর্থিক সংকট ও ঋণের চাপ থেকেও উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
আত্মহত্যার পাশাপাশি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে। সম্প্রতি শিবগঞ্জ উপজেলার নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়নের রসিকনগর গ্রামে পারিবারিক কলহের জেরে ৭৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি তাঁর স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যার পর নিজেও গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এর আগে মনাকষা ও ছত্রাজিতপুর ইউনিয়নেও পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রী হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা সাময়িক মানসিক সংকটের কারণে একটি সম্ভাবনাময় জীবন যেন শেষ হয়ে না যায়। শিশু-কিশোরদের আচরণে পরিবর্তন বা হতাশার লক্ষণ দেখা দিলে তাদের বকাঝকা না করে পাশে দাঁড়াতে হবে এবং সহমর্মিতার সঙ্গে কথা বলতে হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিভাবকদের শুধু সন্তানের ফলাফলের দিকে না তাকিয়ে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও নজর দিতে হবে।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর করলে হবে না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সম্মিলিতভাবে সচেতন হতে হবে।
কোনো পারিবারিক বিরোধ, মানসিক সংকট বা হতাশার পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুলিশের এই পরিসংখ্যান আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আরও সচেতনতা তৈরির প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।