
নিজস্ব প্রতিবেদক | নেত্রকোনা
নেত্রকোনায় বিষমুক্ত সবজি চাষে এগিয়ে আসছেন গ্রামের নারীরা। নিজেরাই গড়ে তুলছেন কৃষাণি সমিতি, নিচ্ছেন কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং অন্যদেরও প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। বছরজুড়ে উৎপাদন করছেন বিষমুক্ত সবজি। যুব ও কৃষাণি সংগঠন গড়ে তুলে গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে দিচ্ছেন পরিবেশবান্ধব কৃষিচর্চা।
জেলার ১০টি উপজেলার মধ্যে পাঁচটি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠেছে কৃষি শিখন কেন্দ্র। এর মধ্যে নেত্রকোনা সদর উপজেলার আমতলা ইউনিয়নের বিশনাথপুর গ্রামের মর্জিনা বেগম এবং আটপাড়া উপজেলার তেলিগাতী ইউনিয়নের মঙ্গলসিদ্ধ কান্দাপাড়া গ্রামের কবিতা খাতুনের উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য। তাঁদের কার্যক্রম আশপাশের গ্রামের মানুষের কাছেও অনুসরণীয় হয়ে উঠেছে। কৃষি পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় জাতের বীজ সংগ্রহ করতেও অনেকে তাঁদের কাছে আসছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিশনাথপুর গ্রামের কৃষি শিখন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধান করছেন কৃষাণি মর্জিনা বেগম। তাঁর উদ্যোগে গ্রামের নারীরা নিজেরাই তৈরি করছেন জৈব বালাইনাশক। পাশাপাশি প্রাকৃতিক উপায়ে বায়োগ্যাস উৎপাদন ও ব্যবহারের কাজেও যুক্ত হয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এসব এলাকায় কৃষিজমিতে ব্যাপকভাবে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করা হতো। তাঁদের দাবি, কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে এলাকার মানুষের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বেড়েছে। অনেকে এখনো চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গর্ভবতী নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যেও কীটনাশকের বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
তবে এসব এলাকায় এখন ধীরে ধীরে বাড়ছে বিষমুক্ত কৃষিচর্চা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বারসিকের মাধ্যমে কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে কয়েকজন নারী প্রথমে চাষাবাদের পদ্ধতি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন। পরে তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হন গ্রামের অন্য নারীরাও। এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশবান্ধব কৃষি উৎপাদনের উদ্যোগ।
কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তাঁরা ফসলের হাসপাতাল সম্পর্কেও ধারণা পান। বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনে ডোনাপাড়া ও গাছগরিয়াসহ বিভিন্ন গ্রামের কৃষাণি ও যুব সংগঠন কাজ করছে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব উদ্যোগের আওতায় গ্রামের প্রায় ৮০ শতাংশ জমিতে বিষমুক্ত পদ্ধতিতে চাষাবাদ হচ্ছে।
এ কাজে উৎসাহ জোগাচ্ছেন গ্রামের প্রবীণরাও। সত্তরোর্ধ্ব আব্দুল কাদের বায়োগ্যাস পদ্ধতি ব্যবহারে নারীসহ গ্রামের অন্যদের উৎসাহিত করছেন।
অন্যদিকে, আটপাড়ার কান্দাপাড়া গ্রামের কবিতা খাতুনের বাড়ি এখন কৃষি শিখন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আশপাশের গ্রামের মানুষ তাঁর কাছ থেকে কৃষি পরামর্শ নিচ্ছেন। পাশাপাশি বিলুপ্তপ্রায় স্থানীয় জাতের বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখছেন তিনি।
স্থানীয় নারীদের অভিযোগ, কৃষিজমি ও জমির আশপাশে কীটনাশক ব্যবহারের কারণে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। তাঁদের ভাষ্য, সড়কের পাশের গাছপালা ধূসর হয়ে মারা যাচ্ছে এবং অনেক জায়গায় গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত দুর্বাঘাসও আগের মতো জন্মাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনা সদর, আটপাড়া, কেন্দুয়া, মদন ও কলমাকান্দা উপজেলায় কৃষক, কৃষাণি, যুবক ও কিশোরীদের নিয়ে মোট ১৬১টি কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা সংগঠন রয়েছে। এর মধ্যে ৫৭টি নারী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ১ হাজার ১৪০ জন নারী। এ ছাড়া ২৩টি কিশোরী সংগঠনের মাধ্যমে কৃষি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছেন ৪৬০ জন।
গ্রামীণ নারীদের এ উদ্যোগ শুধু বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ, পরিবেশ রক্ষা, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে তাঁদের এই প্রচেষ্টা।